কুমিল্লা এবং এখানকার মানুষের ব্যাপারে সারাদেশে খুবই বাজে কিছু ধারণা প্রচলিত ছিল।
যদিও আমার বন্ধু জনি, কামরুল আর সাকিন এবং ছোটভাই বারী—কুমিল্লার ৪ জন প্রিয় মানুষ ও তাদের পরোপকারীসত্তা আমার ভেতর 'কুমিল্লার মানুষ... ' এই বাজে ধারণাকে কখনোই সত্য হিসেবে স্বীকৃতি দিতে দেয়নি।
স্টেরিওটাইপড সেই সব ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য কুমিল্লাকে নিরাপদ নগরী হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি আগেও যেমন ছিল, এখন তার চেয়ে অধিক বাস্তব হিসেবে তা সামনে এসেছে।
বুলেট বৈরাগী, অপ্রতিম এবং সর্বশেষ তাজরিন হ/ত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লার ভাবমূর্তি যে একেবারে তলানিতে এটি নিশ্চিত।
এর জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ করে পুলিশকে দায়ী করার পাশাপাশি কুমিল্লার তৃণমূল থেকে জাতীয় সংসদের জনপ্রতিনিধিদের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
আমি খুবই বেদনার সাথে লক্ষ্য করি যে, প্রাচীন নগররাষ্ট্র সমতট এবং প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় শালবন বিহার কুমিল্লায় হলেও এই নগরের আধুনিক সংস্করণ একেবারে অপরিকল্পিত!
আমি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকের সাথেই আলাপ করেছি যে, এই নগরে এতো পাওয়ারফুল মন্ত্রী, এমপি, নেতা ছিল অথচ এটিকে পরিকল্পিত নগরী হিসেবে তারা গড়ে তুলতে ব্যর্থ!
এখন যে নেতারা রয়েছেন তাদেরও কি কোনো বিশেষ পরিকল্পনা আছে কুমিল্লাকে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব শহর হিসেবে গড়ে তোলার?
দায় রয়েছে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনে কাজ করা আমলাতন্ত্রের প্রতিনিধিদের।
তারা ঢাকার এতো নিকটের শহরটিকে কেন নিরাপদ করতে পারছেন না অথচ পাবলিকের টাকায় বেতন-ভাতা ঠিকই খাচ্ছেন?
আরও দায় রয়েছে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টকেন্দ্রীক সেনাবাহিনীরও।
যদিও তাদের বেসামরিক ক্ষেত্রে কাজ কম, কিন্তু ইন্টেরিমের ২ বছরে যখন সেনাবাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার ছিল তখনও কুমিল্লার নিরাপত্তা অবস্থা নাজুক ছিল।
তারা কি কোনো সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে কুমিল্লাকে সন্ত্রাসমুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে?
কোটবাড়ি এলাকায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যান্টনমেন্ট, কুমিল্লা ক্যাডেট কলেজ, বার্ড, বিজিবির অফিসসহ প্রায় শতাধিক পাবলিক ফাংশনের প্রতিষ্ঠান অথচ এই এলাকাটিতে সন্ধ্যার পরেও এখন আমাদের ছাত্রছাত্রীদের বের হতে অনিরাপদ লাগে।
আর কুমিল্লা শহরের প্রত্যেকটি এলাকায় দিন-দুপুরে ছিনতাই খুবই স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে গেছে।
কুমিল্লা বিষয়ক ফেসবুক গ্রুপগুলোতে চোখ বুলাতেই কুমিল্লা শহরে ছিনতাই আর বাসা-বাড়িতে চুরির ঘটনার বর্ণনা নিত্যনৈমিত্তিক দেখা যায়।
পুলিশ নিশ্চয়ই আছে কুমিল্লায় এবং তারা জনগণের সেবা করে তাদের জান ও মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিনিময়ে পাবলিকের টাকায় বেতন-ভাতাও পেয়ে যাচ্ছেন।
শুধু জনগণের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস পাচ্ছেনা। অপরাধ কমছেনা। অপরাধী ভয় পাচ্ছেনা। চুরি, ছিনতাইয়ের অভয়ারণ্যে তারা খু-নকেও 'নিউ নরমাল' বানিয়ে ফেলেছে!
উপরের এক্টরদের পাশাপাশি, কুমিল্লার 'শিক্ষিত বা সচেতন' নাগরিক সমাজকেও দায়ী করতে হবে, ইনক্লুডিং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদেরও, যারা 'নিরাপদ কুমিল্লা চাই' এই সামাজিক আন্দোলন করে প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারেননি।
কুমিল্লা শহেরর কথিত 'এলাকার লোকাল' লোকগুলোর মধ্যে আত্মকেন্দ্রীক চিন্তাকে পরিহার করে বিনয়ী কৃতার্থ সত্তার প্রবেশ ঘটাতে হবে।
তাদের ভুলে গেলে চলবেনা যে, সারা দেশ থেকে বা কুমিল্লা ও এর আশেপাশের জেলা থেকে আসা মানুষের অবাধ বিচরণই তাদের রুটি-রুজির সহজলভ্য উৎস।
এই শিক্ষার্থী ও কর্মজীবি, চাকরিজীবীরা আছেন বলেই বাসা ভাড়া, দোকান ভাড়া, ব্যবসা-বাণিজ্য ও নানা কাজ করে কুমিল্লা শহরের বড় একটি অংশের মানুষের জীবিকার ব্যবস্থা হয়।
বাইরে থেকে আসা মানুষের হৃদয়ে কুমিল্লা ও কুমিল্লার মানুষের ব্যাপারে যদি ক্রমাগত নেতিবাচক ধারণা জন্ম নেয় তবে এটি দীর্ঘমেয়াদে কুমিল্লার সব শ্রেণির মানুষের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
সামাজিক মর্যাদা বলে কুমিল্লাবাসীর কিছু অবশিষ্ট থাকবেনা।
গুটিকয়েক অপরাধপ্রবণ বা কর্কশ ব্যবহারকারী লোকের জন্য গোটা কুমিল্লার মানুষ ঘৃণা, লজ্জা ও অপমানের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনায় পড়বে।
এখন আমাদের হাতে সময় কম।
কুমিল্লার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও নাজুক হওয়ার পূর্বেই সমস্ত অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
সিএনজি অটোরিকশা, বাইক, মাইক্রো বা ইজি বাইক থেকে শুরু করে রাস্তায় চলা সমস্ত যানবাহনের চালকদের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করতে হবে।
গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সিসিটিভি রাখতে হবে।
দিনে ও বিশেষ করে রাতে টহল পুলিশের কার্যক্রম বৃদ্ধি করতে হবে।
২৪/৭ শুধু কুমিল্লার নিরাপত্তার জন্য অনলাইনে সাইবার পুলিশ ইউনিটের বিশেষ সক্রিয়তা বৃদ্ধি করতে ব্যবস্থা নিতে হবে।
সেই সাথে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তির জন্য ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি চালকদের ব্যক্তিগত জীবনের প্রফাইল প্রশাসনের কাছে রাখতে হবে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে আদালতকে।
অপরাধীর শাস্তি দ্রুত সময়ের মধ্যে নিশ্চিত করতে হবে।
কোনো অপরাধীকে জামিন দিয়ে বা সাজা মওকুফ করে আইনের শাসনের প্রতি অনাস্থা তৈরি করে বিচারব্যবস্থাকে প্রহসন বা হাসির খোরাক বানানো যাবেনা।
সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা গড়ে উঠেছে যে, দেশে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নাই বলে অপরাধীদের মনে ভীতির সঞ্চার হচ্ছেনা।
একই সাথে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা কম বলে ক্রশফায়ার, গণধোলাই, মব ইত্যাদি বেআইনি মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত শাস্তির প্রতি সামাজিক সম্মতি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এটি আদর্শ রিপাবলিকের বৈশিষ্ট্য নয়।
এর জন্য রাষ্ট্রকে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন নীতিকে বাস্তবায়ন করতে।
পুলিশের জনবলের ঘাটতি থাকলে তাদের পাশাপাশি কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের আর্মি এবং সমাজের সচেতন অংশও প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে 'কমিউনিটি পুলিশিং' শুরু করতে উদ্যোগ নিতে পারে।
দেশের নিরাপত্তার নাজুক হাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও উত্তপ্ত করে দিতে পারে এ কথা ক্ষমতাসীনরা স্মরণে রেখে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সবার আগে স্থান না দিলে দেশ অস্থিতিশীল হয়ে উঠার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এ কারণে কুমিল্লার অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে ওঠাকে খণ্ডিত দৃষ্টিতে না দেখে সমগ্রে দেখে টেকসই সমাধানের চিন্তা করা হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
আর কুমিল্লাবাসীরও উচিত নিজেদের এলাকার বদনাম ঘোচাতে চোর-ছিনতাইকারী-ডাকাত-চাঁদাবাজ-ধর্ষক এবং সব ধরনের অপরাধমুক্ত কুমিল্লা গড়ার দৃঢ় অঙ্গীকার করে কাজ করতে অবিলম্বে ঐক্যবদ্ধ হওয়া।
0 Comments