সর্বশেষ

আমি,ফাঁকা ক্যাম্পাস ও ভয়


১।
আমি স্বজ্ঞানে ভয় ভূতে অবিশ্বাসী।ছোট বেলা থেকেই এইসব জ্বীন ফিন,পাতালবাসী,সাদাকাপড়,অশরীরী বিষয়গুলোকে একদমই ভয় পেতাম না।ভূতের গল্প শুনে আমার সমবয়সীরা ভয়ে চুপসে থাকার সময় আমি খিলখিল করে হাসতাম।রাতের বেলা একা জেগে থাকা বা একা একা হাঁটাও আমার ছোটবেলার অভ্যাস।ঢাকা কলেজে বসে নিয়ম করে জাগতাম রাত।জাহাঙ্গীরনগরে এসে রাত জেগে একা একা হাঁটার ষোলকলা পূর্ণ করি।
২।
ক্যাম্পাস এখন ছুটি।প্রায় সবাই চলে গিয়েছে।যারা আছে তারা ঘুম।রাত তিনটার দিকে বেরোলাম ক্যাম্পাস চক্কর দিতে।নিস্তব্ধ,ফাঁকা।পরিচিত ক্যাম্পাসটাকে গোরস্থান মনে হয়েছে।গা ছমছম অবস্থা।হল থেকে বেরিয়ে চৌরঙ্গী দিয়ে ট্রান্সপোর্ট পর্যন্ত ভালোই গেলো।এরপর থেকে খারাপ।কোথাও কোন গার্ড মামা নেই।গাছের পাতা নড়লে মনে হয় কে যেন আসছে।রেজিস্ট্রার ভবন থেকে সোজা রাস্তা দিয়ে সামনে যেতে যেতে মনে হয়েছে কে যেন পিছনে হাঁটছে।আগেই বলেছি ভূতপ্রেতে ভয়ডর আমার নেই।আমি ভয় পাই সাপ।
৩।
কিন্তু অজ্ঞাতকারণে আজ আর পুরো ক্যাম্পাস ঘুরতে ইচ্ছে হলো না।পিছন ফিরলাম।হঠাত্‍ রাজ্যের ভয়ের গল্প মাথায় আসতে থাকলে।বুঝলাম দূর্বল অবস্থায় পেয়ে মস্তিষ্ক মজা নিতে ভুল করছেনা।দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে রেজিস্ট্রারে এসে এক মামাকে পেলাম।আধাবসা হয়ে ঘুমাচ্ছে।উসকু খুসকু।এক বার ডাক দিছি শোনেনি,আরেকবার দিলেও না।তৃতীয়বার কেন যেন দিতে ইচ্ছে হলো না।লোকটাকে অপরিচিত মনে হলো।কেমন যেন ঘুমের মধ্যে আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখতেছে।এবার এক সাথে মেহগনি বাগানের ভেতর থেকে অদ্ভূত সব পাখি ডাকা শুরু করলো।পা নড়ছেনা।ভেতর থেকে তাড়া দিচ্ছে এই জায়গা ছাড়তে।পরিচিত সম্মানিত একজনকে কল করে ভয় কাটাতে চাইলাম।কথা বলে যেন শক্তি পেয়েছি।রাস্তায় এসে ট্রান্সপোর্টের দিকে হাঁটলাম।হঠাত্‍ একটা ডাল ভেঙে পড়লো।যেন গাছ থেকে কেউ ডালটা ভেঙে ছুঁড়ে মারলো।আমার পা আর চলেনা।পাঁচ মিনিটের আল বেরুনী হলে যেতে যেন আমি আর পারবো না।এবার আমি ঘামতে শুরু করেছি।বুঝলাম আমি ভয় পেতে যাচ্ছি।পকেট থেকে টর্চ লাইট হাতে নিলাম।
৪।
ট্রান্সপোর্টের ব্রিজের উপর উঠার পর ভাবলাম সামনে কোন গার্ড মামা হয়তো থাকবে।এই আশায় হাঁটছি আর এক সাথে অনেকের হাঁটার শব্দ!শব্দ আসছে পোস্ট অফিসের ছোট্র গলি থেকে।আমি ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারছিনা।আমি তাকালে যেন তারা একসাথে চুপ করে যায় আর ছোট ছোট বুনো গাছগুলো চুপসে থাকে।এই অবস্থায় ভয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ের দেখা।
ট্রান্সপোর্ট অফিসের সামনে একটি কুকুর দেখে মনে ভরসা পেলাম।যাক কোন প্রাণী আছে।রাতে ঘুরি বলে ক্যাম্পাসের সব কুকুর আমি চিনি।পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সামনের চারটা কুকুর হচ্ছে ভালো।পাহারাদার।কিন্তু আজকের কুকুরটা অচেনা।আমাকে আসতে দেখে কেমন যেন কর্কশ একটা হাঁক ছাড়লো।আমি ভয় পেয়েছি বলে হয়তো এটাকে কুকুরের ডাক মনে হয়নি।তার ডাকে কর্মচারি সমিতির অফিসের ঐদিক থেকে আরেকটা কুকুর এলো।আমি সামনে আস্তে হাঁটছি আর এরাও আমার দিকে আসছে।গোঁ গোঁ করতে এদের গতি বাড়ছে দেখে আমি দৌড়ায় ট্রান্সপোর্ট অফিসের নিচে যাই।না,কোন গার্ড নেই।কুকুর দুইটা দুই গাড়ির আড়ালে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।আমি আল্লাহ আল্লাহ করে বুকে ফুঁ দিয়ে একটা ছোটকাঠ হাতে নিয়ে একটার দিকে সাহস করে মারার ভাণ করলাম।দেখি এটা ভয়ে পিছনে গেল।সাহস পেলাম।হেঁটে বেরিয়ে এলাম।ওরা ঘেউ ঘেউ করে ডাকতে লাগলো।এবার ওদের ডাক কুকুরের মতই মনে হচ্ছে।
৫।
তারপর ফজিলাতুন্নেসার রাস্তাটা দিয়ে হলের দিকে রওনা হলাম।আসতে আসতে ভয় কাটছিল।এরমধ্যে তাকালাম গাড়ির ড্রাইভারে সিটের দিকে।যেন ড্রাইভারের আসনে কে বসে আছে।তার চোখ আছে শুধু,আর আছে হাত।বুঝলাম এসব মাথা থেকে আসছে।প্রত্যেক গাড়ির মধ্যে একই অবস্থা।দৌড় দিয়ে জাকসু পর্যন্ত গেলে সেই পরিচিত কুকুরের একটাকে পেলাম।একটা ডাক দিয়ে সে বোঝালো ভয় নাই আর।আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।মেডিকেল পার হয়ে হলের রাস্তায় ঢুকলাম।আমার পরিচিত কুকুরটা জোরে ডাক দিয়ে জানাচ্ছে সে আছে।আর ভয় নেই।দেখলাম ঘেমে নেয়ে গেছি।পরিবেশ বিজ্ঞানের সামনের তেমাথায় আজ সেই চারটি কুকুর নেই।তারা কোথায় তা জানিনা।

এখন আমি রুমে।ভয় পাওয়ার লৌকিক ব্যাখ্যা খুঁজতেছি মনকে বোঝাতে।এই বয়সে এসে ভয় পেয়েছি এটা মানতে কষ্ট হচ্ছে।সম্ভবত পুরো ক্যাম্পাস এবং হর ফাঁকা হয়ে যাওয়ায় মনের মধ্যে আমার অজান্তে একটি নিঃসঙ্গ জগত তৈরি হয়েছে।সেই জগতই বাড়ি নেয়ার বাহানা তৈরি করতে ভয় ঢুকিয়েছে হয়তো।আর যেসব ঘটেছে তা একা থাকার কারণে ভীতিকর মনে হয়েছে।তবে যা-ই হোক ভয় যে বেশ ভালো রকম পেয়েছি এ কথা আর অস্বীকার করছিনা...।
(৩১ মে ২০১৫।)
পাঠ অনুভূতি

Post a Comment

0 Comments